দেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে গড়ে চার হাজার মেগাওয়াট। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় পিক লোডভিত্তিক (চাহিদা বাড়লে ব্যবহার হয় এমন কেন্দ্র) বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা রয়েছে সাড়ে আট হাজার মেগাওয়াট। এর বেশির ভাগই বেসরকারি খাতের ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র, যেখানে উৎপাদন খরচ সবসময়ই বেশি। তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী, পিক আওয়ারে (দিন ও সন্ধ্যায়) বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেই কেবল এসব কেন্দ্র উৎপাদনে থাকার কথা। কিন্তু বেজ লোডভিত্তিক (সার্বক্ষণিক চালু থাকবে এমন) কেন্দ্রের জ্বালানি সংকটের কারণে উচ্চ মূল্যের পিক লোড কেন্দ্র চালাতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এতে সংস্থাটির আর্থিক ক্ষতি বেড়েই চলেছে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্ত রয়েছে ১৪৪টি কেন্দ্র। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে বেজ লোডভিত্তিক কেন্দ্র রয়েছে মোট ৫২টি, যার মোট সক্ষমতা ১৯ হাজার ২২৯ মেগাওয়াট। অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারিভাবে নির্মিত ৯২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে পিক লোডভিত্তিক।
বিপিডিবির অন্তত তিনজন প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং তাৎক্ষণিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে মূলত পিক লোড কেন্দ্র অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেছে, বেজ লোড কেন্দ্রের জ্বালানি সংস্থান না থাকায় পিক লোডভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহার করা হচ্ছে। সন্ধ্যায় এসব কেন্দ্র বেশি চালানো হয়। তবে গ্রীষ্মকালে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে পিক লোড কেন্দ্রের সক্ষমতা সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিপিডিবি ব্যবহার করে। পিক লোডের কেন্দ্র বেজ লোড হিসেবে ব্যবহার করাকে বিপিডিবির দুর্বল পরিকল্পনার বিষয়টি অস্বীকার করেননি এসব কর্মকর্তা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিপিডিবির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তালিকায় বেজ লোড কেন্দ্রের সক্ষমতা ১৯ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। অথচ দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা এখন পর্যন্ত সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মতো। চাহিদার চেয়ে বেশি সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র মূলত রাজনৈতিক বিবেচনা ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। এতে উচ্চ হারে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তেমনি বেসরকারিভাবে গড়ে তোলা এসব কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ অর্থ গুনতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। এগুলো বন্ধ হলে অযৌক্তিক ব্যয় কমে আসবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পিক লোড বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন খরচ সবসময় উচ্চ। যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র পিক লোড হিসেবে দেখানো হয়, সেগুলোর বেশির ভাগই বেজ লোড হিসেবে ব্যবহার করছে বিপিডিবি। বেজ লোড কেন্দ্রের জ্বালানির পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় তেলভিত্তিক পিক লোড কেন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে। জ্বালানির সংস্থান পর্যাপ্ত নিশ্চিত করা গেলে পিক লোড কেন্দ্র এত বেশি প্রয়োজন হতো না। তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ যেমন কমত, তেমনি বিপিডিবির সামগ্রিকভাবে আর্থিক চাপও কমে আসত।’
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, দেশে কয়লাভিত্তিক সবই বেজ লোড বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এছাড়া গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রও বেজ লোডভিত্তিক। কিন্তু এসব কেন্দ্র কখনই পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারছে না বিপিডিবি। কারণ এগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কিংবা জ্বালানি বিপিডিবির হাতে নেই। সেই সঙ্গে এসব কেন্দ্রের সক্ষমতার বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদাও কম। তাই পিক লোডভিত্তিক কেন্দ্র ব্যবহার হয়।
দেশে পিক আওয়ারে এমনকি গ্রীষ্মে এখন চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পিক লোডভিত্তিক কেন্দ্র ব্যবহার হয়। শীতে তা এক হাজারে নেমে আসে। অথচ বিপিডিবির কেন্দ্রের তালিকায় এখন পিক লোডের কেন্দ্রের সক্ষমতা ৮ হাজার ৫৯৭ মেগাওয়াট। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ১৮-২০ টাকা, যেখানে গ্যাসভিত্তিক বেজ লোড কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে সাড়ে ৩ টাকার মতো। তাই বেশি ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে বিপিডিবির কেন্দ্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যেমন খরচ বাড়ছে, তেমনি এসব কেন্দ্র নির্ধারিত চুক্তি শেষের আগে বাতিলও করা যাচ্ছে না। তবে অদক্ষ ও কার্যক্ষমতা কম এমন বিদ্যুৎ কেন্দ্র কীভাবে উৎপাদন সক্ষমতা থেকে বাদ দেয়া যায় সে বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির শীর্ষ নির্বাহীরা।
জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পিক লোডের অনেকগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র বেজ লোড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। গ্যাস সংকট থাকলে জ্বালানি তেলভিত্তিক প্লান্ট চালিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে হয়। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতেই মূলত বিপিডিবি এগুলো চালাচ্ছে। তবে এটা ঠিক, কিছু পিক লোডের পাওয়ার প্লান্ট অদক্ষ ও ইফিশিয়েন্সি কমে গেছে। যেগুলোর প্লান্ট ফ্যাক্টর কম, আমরা সেগুলো রিভিউ করার একটা উদ্যোগ নিয়েছি। তবে চাইলেই তো এসব কেন্দ্র বাতিল করা যাবে না, আইনগতভাবে সুযোগ নেই। বিপিডিবির এসব কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি হিসেবে নিতে হচ্ছে। বিপিডিবি অপ্রয়োজনীয় খরচ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, আমরা সে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি।’